রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০   চৈত্র ১৪ ১৪২৬   ০৪ শা'বান ১৪৪১

পাবনার খবর
২২

মুজিববর্ষ ২০২০: বঙ্গবন্ধু তুমি আজ বিশ্ববন্ধু

পাবনার খবর

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২০  

বঙ্গবন্ধু জন্ম না নিলে আজ আমরা পরাধীন রাজ্যের নাগরিক থাকতাম; আরো বড় কথা হলো- ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের নামটাই সৃষ্টি হত না। বাঙালির অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যত ইতিহাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে অবদান ঠিক এখানেই। ইতিহাসের তথ্য, বাঙালির জাতি ও এই জনপদের অস্তিত্ব হাজার বছর ধরে চলে আসলেও কখনোই স্বাধীন-সার্বভৌম একক রাষ্ট্র ছিল না। বঞ্চিত বাঙালিকে ভালবেসে নিজের জীবন উৎসর্গ করে বঙ্গবন্ধু সেটা করে দিয়েছেন। শুধু আমরা নয়, গোটা বিশ্ব যাকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে চেনেন, আজ সেই বিশ^বন্ধুর ১০০তম জন্মদিন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীকে ঘিরে আয়োজিত এই মুজিববর্ষ শুরুর শুভ মুহূর্তে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

বাংলাদেশের সবকিছুতেই অনিবার্যভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম জড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা এমন যে, বঙ্গবন্ধুকে বাদ রেখে এক লাইন ইতিহাসও রচিত সম্ভব নয়। হয়তো এ কারণেই কবি-মনীষী অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের আর এক নাম রেখেছেন Mujibland বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি ও বাংলাদেশে চিরস্থায়ী নেতা আখ্যা দিয়ে তিনি এ-ও লিখে গেছেন, ‘যতদিন রবে পদ্মা-যমুনা গৌরী-মেঘনা বহমান/তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ সত্যিই তো! ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানোর যে সূচনা তিনি করেছিলেন, তারই প্রতিফলন ঘটান প্রায় ১৯ বছর পর। ১৯৭১-এ, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তাঁর কাছেই পাওয়া বাঙালির আত্মার সংযোগ, আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। তিনি অবিসংবাদিত নেতা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

জন্মশতাবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুকে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ঘোষণার দিনটি আজ মনে পড়ছে। ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল। শুক্রবার। বাঙালি জাতির জন্য বিশাল আনন্দঘন পুরস্কারের দিন এটি। বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের ভোটে বঙ্গবন্ধু এদিনই ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচিত হন আমাদের জাতির জনক। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ জন বাঙালির তালিকায় প্রথম নামটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিতে (১ বৈশাখ, ১৪১১) ২০ জন বাঙালির মধ্যে এক নম্বর ব্যক্তি হিসেবে বিবিসি বাংলায় বঙ্গবন্ধুর নাম প্রচারিত হয়। 

শেখ মুজিবকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে কেন মনোনীত করেছেন- বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে জাপানের নাগাসাকি শহরের শ্রোতা মনিকা রশিদের বক্তব্য এদিন সবার মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেছিন, ‘আজ আমরা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যে যেখানেই বসে যা কিছু করছি, যা বলছি এর কোনোটাই সম্ভব হতো না যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়টাতে না পেতাম। তিনিই বাঙালি জাতিকে প্রথম বোঝাতে সক্ষম হন যে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি- সর্বোপরি বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে হবে। মৃত্যুভয় বা ক্ষমতার লোভ কোন কিছুই তার দীর্ঘ সংগ্রামী মনোভাবকে দমিয়ে দিতে পারেনি।’ এটাই শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর এক বাক্যের তাৎপর্যপূর্ণ পরিচয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ আসলেই তাঁর সঙ্গে কাটানো কয়েকটি মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। আমি সৗভাগ্যবান এ কারণে যে, আমার রাজনীতির হাতেখড়ি সরাসরি বঙ্গবন্ধুর কাছে। তার ডাকে সাড়া দিয়েই ১৯৬৬ সালে নিজেকে ছাত্রলীগের ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে আবিষ্কার করেছিলাম। ৬ দফার প্রচারণা চালাতে (টাউন হলে জনসভার মাধ্যমে) এদিন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়ার বাসায় এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেখানেই প্রথম দেখা। ভাতিজা সুবাদে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহকর্মী আমাদের প্রিয় চাচা জনাব এম মনসুর আলী, এম এইচ কারুজ্জামানসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বগা চাচা। সেই পরিচয়েই বঙ্গবন্ধুর স্বভাবসুলভ আদরের ‘তুই’ সম্বোধন। সর্বশেষ বলেছিলেন, ‘মাঠে (সভাস্থল) আয়।’

সদ্য এসএসসি পাস করেছি, পরিচয়ে তখনও কলেজের তকমা পাইনি। রাজনীতির কতটুকুই বা বুঝি? কিন্তু ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি র্দীঘদেহী এই মানুষটির স্নেহমাখা ‘মাঠে আয়’ স্বরে কী যে লুকিয়ে ছিল! তা আজও ভুলতে পারি না। সাউন্ডটা কানে বাজে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম, কেউ না নিলেও একা একা জনসভায় যাব। কিন্তু সেটি আর করতে হলো না। সবার সঙ্গেই টাউন হলে গেলাম। বঙ্গবন্ধু ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা শুনলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, মনের অজান্তেই মুগ্ধ শ্রোতা থেকে গগণবিদারী স্লোগানদাতা হয়ে গেছি। মাধ্যমিকেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনুপ্রাণিত ছিলাম। কিন্তু ঘন্টাখানেকের ব্যবধানে আমি যেন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। সেই সক্রিয় প্রবেশ কিছুক্ষণ আগেই বঙ্গবন্ধুর ‘মাঠে আয়’ নির্দেশের মধ্য দিয়ে হয়েছে। এরপর আর পেছনে তাকাইনি। কয়েক মিনিটের সাক্ষাতে পিতা মুজিব যেভাবে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন; সেটাই যে আমাকে পরবর্তীতে এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্রলীগের জিএস, অবিভক্ত পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এবং জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালনে উৎসাহ যুগিয়েছে; তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

১৯৬৬’র পর আরো কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে। যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই তার কাছ থেকে নতুন কিছু শিখেছি। তাঁর প্রগার ভালবাসা, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, অসীম দক্ষতা-যোগ্যতা, বিনয়, কৃতজ্ঞতাবোধ, তেজস্বী ব্যক্তিত্ব সর্বাপরি উৎসাহিত-অনুপ্রাণিত করার আশ্চর্য ক্ষমতা সবসময়ই আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু চলে গেছেন ৪৪ বছর আগে। দীর্ঘ এ সময়ে স্বৈরশাসন, বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন এবং ওয়ান ইলেভেন এসেছে। রাজনৈতিক জীবনেও অনেক উত্থান-পতন দেখেছি, কত কিছু শিখেছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে থাকার সেই মুহুর্তগুলো আজও ভুলতে পারিনি। 

স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্মুখ সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল আমার। যার একটি ঘটনায় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হই। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন্যা কবলিত মানুষকে বাঁচাতে পাবনায় ‘মুজিববাঁধ’ উদ্বোধন করতে এসেছিলেন জাতির জনক। আমি তখন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। স্বাগত বক্তব্যের দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। বক্তৃতা দিলাম। ডায়াস থেকে যখন মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছি, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু আমার হাত ধরে ফেললেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাঁড়িয়ে গিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমু এঁকে বললেন, ‘তুই তো ভালো বলিস’। বঙ্গবন্ধুর বুকে লেপ্টে আছি; কী বলব কী বলা উচিত, বুঝতে পারছিলাম না। মুহুর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম জাতির জনকের দিকে। পরে দুই-একটি কথা বলে স্টেজের সাইডে গেলাম। পরে এই ভেবে উৎসাহি হলাম যে, মাত্র ১৮মিনিট বক্ততৃায় যিনি সাত কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন, লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছেন; সেই মানুষটি যখন আমার ভাষণের প্রশংসা করলেন, তখন সেটা নিঃসন্দেহে ছোট ব্যাপার নয়।

বঙ্গবন্ধুকে ‘গার্ড অফ অনার’ প্রদানের মধ্য দিয়ে যথারীতি অনুষ্ঠান শেষ হলো। বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টারে উঠতে যাচ্ছেন, এমন মুহুর্তে আমার কাছে জানতে চাইলেন, ঢাকা যাব কি-না? আগে-পাছে চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেলাম। প্রথমবারের মত হেলিকপ্টার ভ্রমণের সুযোগ হলো, তা-ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। ঢাকায় হেলিকপ্টার থামলো পুরাতন বিমানবন্দর তেজগাঁওয়ে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে ডাকলেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিলেন, ‘ওকে (আমাকে) বাসায় নিয়ে খেতে দাও, তারপর খরচ দিয়ে পাবনা পাঠিয়ে দিও’।

 ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আরেকবার পাবনা আসেন বঙ্গবন্ধু। জনসভার আয়োজন তখন স্টেডিয়ামে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে সেবারও বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ হলো। বক্তৃতা শেষে বঙ্গবন্ধু ঠিক পূর্বের ন্যায় আমাকে জড়িয়ে ধরেন। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন, আমি যেন ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল পঁচাত্তরে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। জেলা বাকশালের সম্পাদক ও ৫ যুগ্ম-সম্পাদক মিলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই। জাতির জনক সেদিন তাঁর স্বভাব ড্রেসকোড ‘হাফ-শাটর্’ ও ‘লুঙ্গি’ পড়েছিলেন। এই সাক্ষাতের দু’মাস পরেই যে বঙ্গবন্ধু চলে যাবেন, কে জানত সেটা? ভবনে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিলাম। বাকশাল কমিটিতে স্থান দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি আমাদের নানা দিক-নির্দেশনা দিলেন। চলে আসব, ঠিক এই মুহুর্তে ডাকলেন বঙ্গবন্ধু। বললেন- ‘কীরে, আমার সাথে তোছবি না তুলে কেউ যায় না; তোরা কেন যাস’। তাৎক্ষণিক ক্যামেরাম্যান ডাকলেন। ফটোবন্দী হলাম রাজনীতির কবি’র সাথে। বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে নেওয়া সেই ছবি আজও আমি আগলে রাখি। তার কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ স্মৃতিচিহ্ন যে এটাই!

।। দুই।।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন Poet of politics- রাজনীতির কবি। বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি কোনো শক্তির শাসন তিনি মেনে নেননি। এজন্য তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, কারাগারে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। নিজের জন্মদিনগুলোও স্বাধীন বাংলাদেশের কল্যাণে সঙ্গে মিলিয়ে পালন করতে চাইতেন বঙ্গবন্ধু। এক্ষেত্রে দুটো জন্মদিনের (১৯৭১ ও ১৯৭২ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৯৭১: রক্তঝরা ১৭ মার্চ। এদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি’। এর পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাভারাতুর কণ্ঠে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’ অর্থ্যাৎ নিজের জন্মদিনেও বাঙালি জন্য মুক্তির উপহার খুঁজতেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭২: এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ (ভারত) সফর। জাতির জনকের বক্তৃতা শুনতে এদিন কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিল। সভাশেষে রাজভবনে যখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, তখন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার জন্মদিন ১৭ মার্চ। আপনি সেদিন বাংলাদেশ সফরে আসবেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সফরের আগেই আমি চাই আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেবেন।’ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সম্মতি জানিয়েছিলেন। ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলার মাটি স্পর্শ করার আগেই ১২ মার্চ বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল। এই ছিল নিজের জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর চাওয়া ও পাওয়া।


।। তিন ।।
বঙ্গবন্ধু আজ নেই। বেঁচে থাকলে আজ তাঁকে নিয়ে মুজিববর্ষ উদযাপন করত ১৬ কোটি বাঙালি।  সে সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তবে তার আদর্শ ধারণ করে কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ আজ ঠিক গোটা বিশে^র রোল মডেল। মাত্র ৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল যে দেশ, সেটাকে আজ তিনি (শেখ হাসিনা) ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটিতে নিয়ে গেছেন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ দাঁড়ি করিয়েছেন ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়। শুধু বাজেট কেন, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি, মাথাপিছু আয় ও মানবসম্পদ সূচকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান ৩০তম। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে। এইচবিএসসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। আশা করা হচ্ছে- ২০৩৩ সালে বিশ্বের ২৪তম শীর্ষ অর্থনীতির দেশ’ হবে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৩ দশমিক ৫। ২০১৮ সালে তা ১০ দশমিক ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। তাদের হিসাবে ২০২০-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এগিয়ে থাকবে। 

১৯৯০-এর দশকেও বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এখন করছে মাত্র ২১.৩ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার কমে নেমেছে ১১.৩ শতাংশে। ২০১৭ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ২৩.১ শতাংশ, আর অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১২.২ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, তাতে ২০২৩ সালের আগেই দারিদ্র্য হার শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। অতি দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশের কম হলেই তা শূন্য দারিদ্র্য হিসেবে ধরা হয়। 

পাতালরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চন্দ্রা মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত করার পর চন্দ্রা-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম স্টেশন-রংপুর এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। নতুন রেলপথ নির্মাণ, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযুক্তি, ই-টিকেটিং এবং নতুন নতুন ট্রেন চালুর ফলে রেলপথ যোগাযোগে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৪০১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে গড় আয়ুতে আমরা পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছি। দু’দিন আগেই ঢাকা-মাওয়া ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ৫৫ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধন হলো। টানেলের ওপ্রান্তে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। এটা একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তে কেউ ভাগীদার নয়। মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, যা এখন শেষের পথে; নাগরিক জীবনে স্বস্তি দিতে রাজধানীজুড়ে চলছে মেট্রোরেলের দুর্বার গতি। মুজিববর্ষকে ঘিরে দেশের প্রত্যেকটি ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। মহাকাশে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, প্রস্তুতি চলছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের। উন্নয়নের রোড প্ল্যান ধরে নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, বঙ্গবন্ধু টানেল ও এলএনজি টার্মিনাল।

ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগাযোগ চিত্র বদলে দিয়েছে ফ্লাইওভার, ব্রিজ। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গতি যোগ করতে দেশে গড়ে উঠছে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ইতোমধ্যে ১৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের জন্য আসছেন। সারাদেশে ২ ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও আমাদের চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য এই ‘এগিয়ে যাওয়া’সত্যিই আমাদের মনে শিহরণ তোলে, আশা জাগায়।

তবে এতকিছুর পরও শূণ্যতা থেকেই যায়। দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা আমাদের প্রিয় নেতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু চলে যাওয়ার ১০দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকী ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫: মুজিব, স্থপতির মৃত্যু’ শিরোনামে লিখেছিল, ‘‘তাঁর উদ্যোগগুলো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে গৃহীত হলেও অনেকেই সমালোচনামুখর হয়ে উঠেন। এই সমালোচকদের উদ্দেশ্যে মুজিব তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন:- ‘ভুলে যেওনা আমি মাত্র তিনবছর সময় পেয়েছি। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যেটুকু সম্ভব, তার সবটুকুই করা হয়েছে।’  সন্দেহাতীতভাবেই মুজিবের উদ্দেশ্য ছিলোÑ তার দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন ঘটানো। সে উদ্দেশ্যে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুজিব একটা ‘সোনার বাংলা’ গড়তে চেয়েছিলেন।’’ যে ‘সোনার বাংলা’র উপমা তিনি পেয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে; ভালোবেসে শেখ মুজিব সেই ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নকে তার দেশের জাতীয় সংগীত নির্বাচন করেছিলেন।

বিশ্বাসঘাতকের দলকে বঙ্গবন্ধুকে ‘সোনার বাংলা’ গড়তে দেয়নি। যদিও সর্বেসর্বাই বিশ্বাস করি, মুজিবকন্যা দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, সোনার বাংলার পথে। বঙ্গবন্ধুর বলে যাওয়া সেই কথাটার সঙ্গে আমরাও গলা মিলিয়ে বলতে চাই, ‘আমার বাংলা রূপসী বাংলা, আমার বাংলা সোনার বাংলা।’ বছরব্যাপী শুরু হওয়া মুজিবর্ষের শুভক্ষণে স্বপ্ন দেখছি, বিশ্বাস করছি এ বর্ষেই ‘সোনার বাংলার চলন্ত ট্রেন’-এ উঠব।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


 
 

পাবনার খবর
এই বিভাগের আরো খবর