সোমবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ১২ ১৪২৬   ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

পাবনার খবর
২২

কেমন হলো সিটি নির্বাচন?

পাবনার খবর

প্রকাশিত: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে কোথাও বড় ধরনের কোনো গোলযোগ হয়নি। দুএকটি কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকরা মৃদু সংঘর্ষে জড়ালেও কোনো কেন্দ্রেই ভোট বাতিলের মতো পরিস্থিতি হয়নি।

তবে এবার শান্তিপূর্ণ ভোট হলেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। ভোটের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল– আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি শুরু থেকেই পরষ্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে থাকায় ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যতটো আস্থাবান ছিল, বিএনপি ছিল ততটাই হতাশ। জয়ের জন্য আওয়ামী লীগ সাধ্যমতো সব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে বিজয় ছাড়া আওয়ামী লীগ আর কিছু ভাবেনি।

অন্যদিকে বিএনপির লক্ষ্য বিজয় অর্জন ছিল না। তারা জানতো তাদের জয়ের মতো রাজনৈতিক বাস্তবতা দেশে বিরাজ করছে না। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে বিএনপি এখন বিপর্যস্ত ও এলোমেলো অবস্থায় আছে। সংগঠিতভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেয়ে বিএনপি শুধু সরকারবিরোধী বক্তব্য  এবং নানারকম হুমকিধমকি দিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়- এই কথা বিএনপি এত বেশি বলেছে যে, মানুষ ধরেই নিয়েছে, বিএনপির জেতার কোনো আশা নেই। যারা নিজেরা জেতার আশা করে না, তাদের সমর্থকরা স্বভাবতই ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার আগ্রহ বোধ করেনি। ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত করার কোনো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বিএনপির ছিল না।

নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার অসংখ্য অভিযোগ হয়তো তোলা হবে।  ভোট শেষ হতে না হতেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে একগাদা অভিযোগ উত্থাপন অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের সবগুলো বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের মারপিট করে বের করে দেওয়ার ঢালাও অভিযোগ করা ঠিক নয়। আবার কিছু কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেওছে। আমি নিজে ঢাকা দক্ষিণের প্রায় ২৫টি কেন্দ্র ঘুরে মাত্র তিনটিতে বিএনপির পোলিং এজেন্ট দেখেছি। অন্যগুলোতে বিএনপির কোনো এজেন্ট উপস্থিতই হয়নি। এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাইরে রাখা হতে পারে- এটা জানা সত্ত্বেও বিএনপি প্রতিকারমূলক কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা বলা হলেও বিএনপির কাউকে কোথাও দেখা যায়নি। কেন এমন হলো? ধানের শীষের ব্যাজ পরে ঘোরাটা নিরাপদ নয়- এটা যদি সত্যও ধরে নেওয়া হয়, তাহলেও বলার কথা এটাই যে, বিএনপি নেতারা বড় বড় কথা বলেন কেন? কোন সাহসে কোন ভরসায়? গ্রেপ্তার-নির্যাতন একেবারেই হবে না, এটা কি বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা? বিরোধীদের সঙ্গে গলায় গলায় ভাব করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার অনুকূলে বিএনপির কোনো ভূমিকা আছে কি?

পুরো ঢাকা শহর দখলে ছিল আওয়ামী লীগের। ভোটকেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগের এমন শোডাউন দরকার ছিল না। কোনো বাড়াবাড়ি মানুষ ভালো চোখে দেখে না। বিএনপিকে আওয়ামী লীগ যতটা দুর্বলভাবে বিএনপি যে ততটা দুর্বল নয়, তাদের জনসমর্থনে যে ধস নামেনি, তা তাদের প্রাপ্ত ভোট থেকেই বোঝা যায়। বাইরে তেমন উপস্থিতি টের পাওয়া না গেলেও নীরবে ভোট দিয়েছেন ধানের শীষের সমর্থকরা। তর্জন-গর্জনের চেয়ে নীরব ভোট বিপ্লবের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করতে পারলেই সুফল পাবে বিএনপি।

এবার সিটি নির্বাচন ইভিএমে হলো। ইভিএমে ভোট দিতে ভোটাররা খুব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, এমন অভিযোগ শোনা যায়নি। বরং ইভিএমে দ্রুততম সময়ে ভোট দেওয়া যায় বলে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। অথচ ড. কামাল হোসেনের মতো একজন প্রবীণ নেতা বললেন ইভিএমে ভোট দেওয়ার গতি নাকি শ্লথ। আর,বিএনপি তো শুরু থেকেই ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছে। আধুনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিএনপি কীভাবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে?

তবে এটা ঠিক নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অংশ নিলেও শেষপর্যন্ত ভোটযুদ্ধে থেকে বিএনপি ভালো করেছে। বিএনপিকে এভাবেই ধীরে ধীরে পায়ের নিচে মাটি সংগ্রহ করতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কথাও তাদের মনে রাখতে হবে। একুশ বছর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে।

সিটি নির্বাচন থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। এই যে ভোটের প্রতি মানুষের অনাগ্রহ বা অনাস্থা সেটা কোনোভাবেই ভালো লক্ষণ নয়। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে চাই তাহলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। বিপুল অর্থ ব্যয় করে ভোটের আয়োজন করার পর মানুষ যদি ভোট দিতে না চায়, তাহলে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তি পাবে কীভাবে? নির্বাচন নিয়ে নানা রকম সমালোচনা হবে। বিএনপি হয়তো এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যানও করবে। পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞরা নানা মতামত দেবেন। কিন্তু তাতে ভোটের ফলাফল বদলাবে না।

যারাই মেয়র হবেন তাদের দুই জনকেই আগাম অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলার কথা এটাই যে, আপনারা ভোটের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন। ভোটের ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে যে সমালোচনা তা মানুষ ভুলে যাবে যদি আপনারা নাগরিক জীবনকে স্বস্তিময় করতে পারেন। আপনারা ব্যর্থ হলে, আপনারা অঙ্গীকার ভুলে গেলে বদনাম হবে দলের। মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করুন। মানুষকে বিরূপ ও বিরক্ত করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পাবনার খবর
এই বিভাগের আরো খবর