বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ১৭ ১৪২৬   ০৭ শা'বান ১৪৪১

পাবনার খবর
২০৬

অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

পাবনার খবর

প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০১৯  

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে গত দশ বছর ধরেই নানা রকমের পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ এক্ষেত্রে এক বড় সাফল্য। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সতেরো কোটি। কিন্তু অনেকেরই একাধিক মোবাইল ফোন থাকায় গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি আর প্রায় ৩ কোটি রযেছে ফেসবুক ব্যবহারকারী।

দিন দিন এই সংখ্যা আরো বাড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমানে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ইমু , ইউটিউব ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরাও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারছে। আর এভাবেই দেশ ও জাতি নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কারেরই রয়েছে উভয়দিক- আশির্বাদ ও অভিশাপ। ইন্টারনেটের আশির্বাদের কল্যাণে মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে তেমন অভিশাপের কারণেও মানুষ বিপদগ্রস্ত হচ্ছে বিশেষ করে শিশু ও তরুণ-তরুণীরা। খেলাধূলায় বিমুখ হয়ে ইন্টারনেটের দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোররা। শিশু-কিশোররা হচ্ছে অপব্যবহারের প্রধান শিকার।

কারণ সীমাহীন কৌতুহল নিয়ে নতুন কিছু জানার আগ্রহে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে সাধারণের চেয়ে অনেকগুণ বেশী। স্কুলগামী শিশু, কিশোর, কিশোরীরা নিষিদ্ধ সাইটের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এর কারণ হলো নিষিদ্ধ সাইটের সহজলভ্যতা। এরই ফলশ্রুতিতে সমাজে বাড়ছে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন, হয়রানি ও খুনের মত ভয়াবহ ঘটনা।

বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ ইউ-রিপোর্টার অনলাইনে নিপীড়নের শিকারের কথা জানিয়েছেন। ইউ-রিপোর্ট হচ্ছে বিনামূল্যে সামাজিক বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম, যা ব্যবহার করে যে কেউ বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে তার উদ্বেগ তুলে ধরতে পারেন। ইউনিসেফ এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাবিষয়ক জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি (এসআরএসজি) কর্তৃক প্রকাশিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোয় জরিপটি প্রকাশ করা হয়। ১৩ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি ইউ-রিপোর্টার এই জরিপে অংশ নেন। বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, বলিভিয়া, ব্রাজিলসহ ৩০ টি দেশে এই জরিপ চালানো হয়।

আমরা সাধারণত মনে করি, গ্রামের চেয়ে শহরের মেয়েরা অনলাইনে বেশি যুক্ত। এটা বড় কথা নয়। অনলাইনে যুক্ত হওয়া দোষের কিছু নয়। সমস্যাটা তখনই হয় যখন আমরা অনলাইনের সঠিব ব্যবহার করতে পারি না। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেসব শিশু নির্যাতনে ঘটনা দেখি যার বেশিরভাগই শুরু হয় অনলাইনে এবং শেষ হয় সরাসরি যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে শুধু শিশুদের সচেতন হলে চলবে না, প্রয়োজন অভিভাবকসহ সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমে জানতে হবে অনলাইনে যৌন নির্যাতনের মাধ্যম এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় ও করণীয়।

অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতনের মাধ্যমগুলো হলো ওয়েবক্যাম, সাইবার বুলিং, সেক্সটিং, সেক্সটরশন, গ্রুমিং, পাসওয়ার্ড হ্যাকিং ইত্যাদি। আর সবগুলো ঘটনায় ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আর সবচাইতে বেশি নির্যাতন হয় সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে। সাইবার বুলিং হলো অনলাইনে কোন শিশুকে প্রলুব্ধ বা হেয় প্রতিপন্ন করা, ভয় দেখানো এবং মানসিক নির্যাতন করা।

কিশোর-কিশোরী ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে স্বনামে বা ফেক আইডির আড়ালে প্রাপ্ত বয়স্ক অনেকে এ ধরনের হীন কাজে জড়িত থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও ইমেলে বা ফোনেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা একবার ঘটলে বিকৃত ও অসুস্থ মানসিকতার আরো অনেকের কাছে আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজ বা যোগাযোগের তথ্য চলে যায় বলে এর মাত্রা বাড়তেই থাকে।

এর ক্রমবর্ধমান চাপে শিশুর মাঝে হতাশা, লেখাপড়ার প্রতি অনীহা এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। সাবেক টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের দেয়া তথ্য মতে, দেশের তিন-চতুর্থাংশ নারীই সাইবার নিপীড়নের শিকার যার মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ প্রকাশ করে অভিযোগ আনে। অন্যরা সামাজিকতার ভয়ে গোপন রাখে।

ইন্টারনেট ফিশিং বলতে প্রতারণার মাধ্যমে কারো কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন নাম, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করাকে বোঝায়। নিষিদ্ধ সাইটের প্রবেশের সহজলভ্যতাও শিশু যৌন নির্যাতনের অন্যতম কারণ।

সবার আগে অভিভাবককেই এগিয়ে আসতে হবে। হতে হবে সন্তানের বন্ধু। সাইবার বুলিং কী, অপরিচিত বা অনলাইন বন্ধুরা কেন অনিরাপদ এবং তাদের সাথে কেন ব্যক্তিগত কিছু শেয়ার করা যাবে না- এসব সন্তানদের বুঝিয়ে বলতে হবে। সম্ভব হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সন্তানের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। সর্বোপরি সন্তানেরা অনলাইনে কি করছে তার উপর নজর রাখতে হবে। অনলাইনে যুক্ত থাকার সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে সন্তানকে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।

অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষকের ভূমিকাও অপরিসীম। শিক্ষক মানেই সচেতন ব্যক্তি। তাই শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কী করণীয়, কী বর্জনীয় এবং কেমন করে তাঁরা আদর্শ নাগরিক হতে পারে সে ব্যাপারে সচেতনতামূলক আলোচনা করেন তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহারে শিক্ষার্থী অনেক সচেতন হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর সচেতনতামূলক কর্মশালা বা মতবিনিময় এবং আলোচনা সভার আয়োজন করতে পারে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরকেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করতে হবে।

পর্ণো-সাইট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আনন্দের বিষয় এই যে, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী- সরকার ইতোমধ্যে অনেক পর্ণো-সাইট বন্ধ করেছে এবং আরো অনেক পর্ণো-সাইট বন্ধের উদ্যেগ নিয়েছে। সাইবার অপরাধ আইনে শিশুদের বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে।

বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ইন্টারনেটের অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। ১৮ বছরের নিচে কেউ যেন পর্ণো-সাইটে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে যাতে অভিযোগ করতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার না হয়। ইন্টারনেটের ক্ষতিকর সাইটগুলো ফিল্টারিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারিক কার্যক্রমে ক্যামেরা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করতে হবে। পাঠ্যসূচিতে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত করে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।

যৌনতা প্রাণিজগতে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয়, যখন তা পর্ণোগ্রাফির মতো একটি বিষয়ে আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। আমাদের দেশে যৌনতা এখনও ট্যাবু। কিন্তু এই ট্যাবু ভেঙ্গে বাবা, মা, শিক্ষক এবং বয়স্কদের উচিত শিশু-কিশোরদের সঠিক তথ্য জানানো।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন আমাদের জন্য অপরিহার্য, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব থেকেও শিশু, দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রযুক্তিগত বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত যে কোনো তথ্য বা সংবাদের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে বিশ্বাস না করা বা অন্যকে জানানো উচিত নয়। আর শিশু-কিশোর ও তরুণদের ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমকেও এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। অনলাইনে যৌন নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে আরো বেশি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

পাবনার খবর
এই বিভাগের আরো খবর